এমন কিছু স্থান আছে যেখানে গেলে অকারণে, অহেতুক গা ছমছম করে। ঐ স্থানে পুনরায় যেতে ভয় হয়। কোন ভূতের গল্প শুনলে শুধু ঐ স্থানটার কথা মনে পড়ে। এমনই একটা ভয়ানক স্থান হচ্ছে আমাদের বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড় বাগান। (আমার কাছে ভয়ানক)
আমি জন্ম থেকে ঐ স্থান টাকে বড় ভয় পেতাম। কোন দিন শুনিনি ঐ স্থানে কাউকে ভূত বা প্রেত ধরেছে অথবা কেউ খারাপ কিছু দেখেছে। এর অতীত ও খারাপ ছিল না। আমার মনে কেন বা কী জন্য এমন একটা ভীতি সৃষ্টি হলো ঐ স্থানের জন্য তা আমি বলতে পারবো না। একবার যখন আমার মনে ভয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে তা আর দূর করা সম্ভব না। এটা এমনই ভাবে আমার মনে ভয় হিসেবে গেঁথে গিয়েছে যে, তা হাজার চেষ্টা করেও দূর করতে পারলাম না।
আমার বাড়ির ঠিক পিছনে একটা বাঁশঝাড় আছে। যেখানে মানুষের যাতায়াত নেই বললে চলে। বাঁশ ঝাড়ের মাঝে কিছু বট গাছ রয়েছে। মাঝে মাঝে বট গাছ গুলোকে দেখতে দৈত্যের মতো মনে হয়। এই স্থানটা দিনের বেলাতেও অনেক অন্ধকার হয়ে থাকে। বড় বড় গাছের কারনে সূর্যের আলো পাতা ভেদ করে মাটিতে এসে পড়তে পারেনা। রাতে আমি কখনো সেখানে যায়নি। দিনের বেলায় ঐ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। কেন জানি মনে হয় কিছু একটা এখনই ঘটে যাবে। শান্ত পরিবেশ , নির্জন, নিস্তব্ধতা এখানে সবসময় বিরাজ করে। প্রকৃতিও মনে হয় শব্দ করতে চায় না পাছে কেউ বিরক্ত হয়। আর এমন ভয়ানক নিস্তব্ধতা আমার ভয়টাকে আরও বারিয়ে তুলে।
আমি বাঁশঝাড়ে বিশেষ যেতাম না শুধু পেয়ারা খাবার লোভে মাঝে মাঝে যেতাম। বাশ বাগানের পাশেই একটা পেয়ারা গাছ ছিল আমাদের। আমার কাছে এই স্থানটা পৃথিবীর সেরা ভয়ানক তম স্থান বলে মনে হতো। আমি অনুভব করতাম কেউ আমার উপর নজর রাখছে। আমি কি করবো বা কি করছি তা একজন বা একাধিক ব্যক্তি খুব ভালো করে নজর রাখতো। ( একজন বা ব্যক্তি কথাটি ভুল এখানে কোন খারাপ কিছু হবে)। তারা আমার কি ক্ষতি করবে বা আদও করবে কিনা তা আমার জানা ছিল না কিন্তু আমি ভালো ভাবেই বুঝতে পারতাম এরা এই পৃথিবীর কোন বাসিন্দা না। বাশঝাড় থেকে ফিরবার পথে মনে হতো কেউ আমার পিছু নিয়েছে। আমি এই অদৃশ্য শক্তি কে দেখতে পেতাম না কিন্তু অনুভব করতে পারতাম। তার অস্তিত্ব যে আছে তা উপলব্ধি করতে পারতাম কিন্তু সে কতটুকু তার পরিমাপ আমার জানা ছিল না। আমার সদা সর্বদা মনে হতো এই বার সে আমার গলা টিপে ধরবে বা আমি অনুমান করতে পারবো না এমন কিছু ঘটবে।
এই বাঁশ বাগান কে কেন্দ্র করে আমার যে ভয়ভীতি তা আমি আমার পরিবারের কাউকে জানায়নি পাছে তারা আমাকে ভীতু ভাবে। স্থান টা ভালো ছিল না, কেমন একটা অস্বস্তি লাগতো। এই অস্বস্তি টা যে আমার কীসে?তা আমি আপনাদের বোঝাতে পারব না।
এই বাঁশ বাগানে আমি কোন দিন খারাপ কিছু দেখিনি তবুও এটার প্রতি আমার যে ভয় সৃষ্টি হয়েছে তা এই জীবনে আর দূর হবে না। কাদের যেন অস্তিত্ব আমি এই বাঁশ বাগানে উপলব্ধি করতাম। এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে? বা এরা কী চায়? প্রশ্ন গুলো আমার মাথায় সর্বদা ঘুরপাক খায়। তারা মানুষ ও নয় আবার জীবও নয়, তাহলে তারা কী? কীসের আশায় এমন একটা স্থানে এরা দিনের পর দিন বন্দী জীবন পার করছে?
আরও একটা জিনিস আমাকে বড় অস্বস্তিতে ফেলতো, তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আমি তাদের দেখতে পাই না। তারা হয়তো তাদের চেহারা দেখাতে চায় না বা দেখাতে পারে না।
মাঝে মাঝে মনে হয়, এরা এক সময় আমাদের মতো পৃথিবীর লোক ছিল। কোন এক কারনে কষ্ট, হতাশা আর দুঃখ নিয়ে এরা বিলীন হয়ে আবার অন্য এক রূপে পৃথিবীতে হাজির হয়েছে। এরা যখন মানুষ ছিল তখন, তারা কারও ক্ষতি করেনি বরং তাদের ক্ষতি কেউ করেছে আর এখন অন্য রূপে এসেও তারা কারও ক্ষতি করবে না এমন ধারনায় ছিল আমার মনে মনে। তারা জন্ম-মৃত্যুর দুইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছে।
পৃথিবীর কোন একটা শূন্য স্থান পূরন করে তারা পৃথিবীতে বাস করছে। পৃথিবী যতদিন ধ্বংস না হবে ততদিন তারা এই পৃথিবীর একটা স্থান পূরন করে যাবে। পৃথিবীতে শূন্য স্থান বলতে কিছু থাকে না।
jobayer hossen
